
মোস্তাফিজুর রহমান জীবন, বিশেষ প্রতিনিধি,রাজশাহী।
রাজশাহীর দুর্গাপুরে অবৈধ রাসায়নিক সার উদ্ধারের পর ‘৩২৫ বস্তা সার গায়েব’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদকে মিথ্যা, তথ্যবিকৃত ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ বিষয়ে সার উদ্ধার, গণনা, সরকারি মূল্যে কৃষকদের মধ্যে বিক্রি এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নথিপত্র উপস্থাপন করেছে প্রশাসন।
একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী মো. সাইদুল ইসলামও লিখিত বক্তব্য দিয়ে সারের বস্তা গায়েব হওয়ার অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
অভিযানে ৬৭০ বস্তা সার জব্দ
প্রশাসনের লিখিত তথ্যমতে, গত ১০ সেপ্টেম্বর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দুর্গাপুর উপজেলার কিসমতগণকৈড় ইউনিয়নের আড়ইল গ্রামের ব্যবসায়ী মো. সাইদুল ইসলামের তালাবদ্ধ বসতবাড়িতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে হাবিবা ফারজানা।
অভিযানের সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী, স্থানীয় ইউপি সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের উপস্থিতিতে বাড়িতে থাকা সার গণনা করা হয়।
গণনায় বারান্দা ও ভেতরের কক্ষে ৩২৪ বস্তা ডিএপি, ২৪৬ বস্তা ইউরিয়া এবং ১০০ বস্তা টিএসপি পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৬৭০ বস্তা সার জব্দ করা হয়।
বিক্রি ও সরকারি কোষাগারে অর্থ জমার দাবি
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জব্দ করা ৬৭০ বস্তা সারের কোনো অংশ গায়েব হয়নি। কৃষি কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নির্ধারিত সরকারি মূল্যে স্থানীয় কৃষকদের কাছে সারগুলো বিক্রি করা হয়েছে।
প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সার বিক্রি করে মোট ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২৫০ টাকা পাওয়া যায়। ওই অর্থ ই-চালানের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্দিষ্ট কোডে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত চালান নম্বর ২৬২৭-০০১৭১১৪৪৫২২১ এবং বিক্রির মাস্টাররোল সরকারি হেফাজতে সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
দুই উপজেলায় মোট এক হাজার বস্তা সার জব্দ
প্রকাশিত সংবাদের বিভ্রান্তির কারণ হিসেবে প্রশাসন জানিয়েছে, একই দিনে পার্শ্ববর্তী পুঠিয়া উপজেলার কার্তিকপাড়া বাজারে সাইদুল ইসলামের মালিকানাধীন ‘মেসার্স নিশি কীটনাশক বিপণী’তেও অভিযান চালানো হয়। সেখানে পুঠিয়া উপজেলা প্রশাসন আরও ৩৩০ বস্তা সার জব্দ করে।
অর্থাৎ, দুর্গাপুর ও পুঠিয়া—দুই উপজেলা মিলিয়ে সাইদুল ইসলামের মোট ১ হাজার বস্তা সার জব্দ করা হয়েছিল বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুঠিয়া উপজেলার ৩৩০ বস্তা সারের বিষয়টি উল্লেখ না করে দুর্গাপুরের হিসাবের ভিত্তিতে ৩২৫ বস্তা সার গায়েবের অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে দাবি প্রশাসনের।
ব্যবসায়ীর লিখিত বক্তব্য
অভিযুক্ত ব্যবসায়ী মো. সাইদুল ইসলাম তাঁর লিখিত বক্তব্যে জানান, তাঁর কোনো সার বিক্রির লাইসেন্স ছিল না। চট্টগ্রাম, যশোর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে সার এনে নিজ বাড়িতে অবৈধভাবে মজুত করে মৎস্যচাষীদের কাছে বিক্রি করতেন বলে তিনি স্বীকার করেছেন।
তিনি আরও দাবি করেন, অভিযানের সময় উপস্থিত সবার সামনে বস্তা গণনা করে ৬৭০ বস্তা সার জব্দ করা হয়। ফলে সারের হিসাব কম-বেশি হওয়ার সুযোগ নেই।
এছাড়া প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে তিনি কোনো সাংবাদিক বা পত্রিকার সঙ্গে কথা বলেননি কিংবা কোনো জবানবন্দি দেননি বলেও লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
তদন্ত কমিটি গঠন
ঘটনার প্রকৃত বিষয় উদঘাটনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা) বেলায়েত হোসেনকে আহ্বায়ক করে এ কমিটি গঠন করা হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর সারের হিসাব, জব্দ, বিক্রি ও সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।





