

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির শঙ্কা, ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন
বেনাপোল প্রতিনিধি : মনির হোসেন
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। গন্তব্যভেদে পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে ট্রাক সংকট দেখা দেওয়ায় অনেক আমদানিকারক সময়মতো পণ্য খালাস ও দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে পারছেন না। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয়সহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। নতুন দামে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। নতুন দাম রোববার রাত ১২টার পর থেকে কার্যকর হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর বেনাপোল থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাক মালিকরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেনাপোল থেকে ঢাকায় আগে একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ২০ থেকে ২১ হাজার টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা হয়েছে। চট্টগ্রাম রুটে আগে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও এখন ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। গাজীপুর, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জ রুটেও ভাড়া প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বেড়েছে।
এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীরা। অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীদের আগে থেকেই বার্ষিক চুক্তি থাকায় হঠাৎ করে ভাড়া বাড়ানোর কারণে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে তাদের। কেউ কেউ লোকসান দিয়েও পণ্য পরিবহন করছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ট্রাকচালক নাজমুল ইসলাম বলেন, বেনাপোল-ঢাকা-বেনাপোল রুটে একটি ট্রিপে প্রায় ১৫০ লিটার জ্বালানি তেল প্রয়োজন হয়। প্রতি লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ায় শুধু জ্বালানি খরচই কয়েক হাজার টাকা বেড়েছে। এর সঙ্গে ফেরি ভাড়া, সেতুর টোলসহ অন্যান্য ব্যয় রয়েছে। এসব কারণে প্রতি ট্রিপে বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে।
অপর চালক সাদ্দাম হোসেন বলেন, তিনি কেমিক্যাল নিয়ে ভালুকার উদ্দেশে যাচ্ছেন। আগের তুলনায় প্রায় চার হাজার টাকা বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে বলে জানান তিনি।
বেনাপোল স্থলবন্দর হ্যান্ডলিং শ্রমিকরা জানান, বন্দরে দুই ইউনিয়নের প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক প্রতিদিন পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজে যুক্ত। ট্রাক সংকট ও ভাড়া বৃদ্ধির কারণে আমদানি করা অনেক পণ্য সময়মতো খালাস হচ্ছে না। আগে প্রতিদিন যেখানে ৪০০ থেকে ৬০০ ট্রাক পণ্য লোড-আনলোড হতো, বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা জানান।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজী বলেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ফেরি ভাড়া ও টোলসহ বিভিন্ন ব্যয় বাড়ায় দেশের বিভিন্ন রুটে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বেড়েছে। এর পাশাপাশি ঢাকা থেকে ফেরার পথে অনেক সময় ট্রাকের জন্য পর্যাপ্ত পণ্য পাওয়া যায় না। ফলে ট্রাক মালিকদের একমুখী পরিবহনের খরচও পুষিয়ে নিতে হচ্ছে। এতে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, প্রতিদিন বেনাপোল বন্দর থেকে দুই শতাধিক কাভার্ড ভ্যানসহ প্রায় ৫০০ পণ্যবাহী ট্রাক দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাড়া বৃদ্ধি ও ট্রাক সংকটের কারণে স্বাভাবিক পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।
বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলহাজ মতিয়ার রহমান বলেন, বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর ট্রাক মালিকরা গন্তব্যভেদে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়েছেন। এতে ব্যবসায়ীদের পরিবহন খরচ বেড়েছে। অতিরিক্ত খরচের প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে পড়তে পারে বলে তিনি জানান।
বেনাপোলের সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও ট্রাক সংকটের কারণে পণ্য পরিবহনের খরচ অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে কাঁচা ও পচনশীল পণ্য দ্রুত খালাস করে গন্তব্যে পাঠাতে না পারলে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে পণ্য পরিবহন করছেন।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের যুগ্ম সম্পাদক ও আমদানিকারক এজাজ উদ্দিন টিপু বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খরচও বেড়েছে। এর প্রভাব বিভিন্ন পণ্যের দামের ওপর পড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের বাড়তি দামে পণ্য কিনতে হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বেনাপোল বন্দরের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি ও পরিবহন খরচের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ও বাজারদরেও এর প্রভাব পড়তে পারে।




